দুঃখিত আপনি মিথ্যা বলছেন
মিথ্যা ! দুই অক্ষরের নিরীহ দর্শন এক শব্দ; কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর মাহাত্ম্য(!) মোটেই এতটা নিরীহ নয় সেই ছোট্ট বেলার “রাখাল বালক ও বাঘ” এর গল্প দিয়েই সম্ভবত আমাদের মিথ্যা না বলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়, এরপর সারাজীবন ই নানা জায়গায় নানা ক্ষেত্রে আমরা মিথ্যা বলা টাকে ‘খারাপ’ একটি কাজ হিসেবে জেনে এসেছি। এটি নিঃসন্দেহে খারাপ একটি কাজ, সেটা বলাই বাহুল্য, কিন্তু আজকাল আমরা অনেকেই মিথ্যা বলা টাকে একটা ‘আর্ট’ মনে করছি এবং এটাকে মডার্ন লাইফ স্টাইলের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই ধরে নিচ্ছি ,ফলে এমনটা হয় যে- সত্য কথা বলার সূযোগ থাকলেও আমরা কখনো কখনো ইচ্ছে করেই মিথ্যা কথা বলে নিজেকে স্মার্ট(!) প্রমাণ করার চেষ্টা করি।আবার বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে হাসি-তামাশার মোড়কে দুষ্টু-মিষ্টি কতাচ্ছলে ছোটো বড় অনেক ধরণের মিথ্যা কথার আদান-প্রদান তো প্রায় প্রতিদিন ই ঘটছে।
আর তাই চারিদিকে এত সব মিথ্যার ভীড়ে কখন যে কে সত্য বলছে ইদানীং সেটা বুঝে ওঠাই দুষ্কর ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।
কিন্তু একটু দাড়ান !
কেউ আপনাকে কোনো কথা মিথ্যা বলছে কি না- সেটা বুঝতে পারার কি আদৌ কোনো উপায় নেই?
বা যদি এভাবে বলি, এমন কি কোনো বুদ্ধি আছে যা দিয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে যে ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন, তার মধ্যে কোন কথা গুলো সত্য আর কোন গুলো মিথ্যা তা ধরতে পারা যাবে?
উত্তর হল- হ্যা, কিছু চমৎকার টেকনিক অনুসরণ করে কোনো ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলছে কি না আমরা তা সনাক্ত করতে পারি। তো কি হতে পারে সেই টেকনিক গুলো?আসুন কিছুক্ষণের জন্য ডুব দেই সাইকোলজির বিচিত্র জগতে –
” শরীরের অস্বাভাবিক ভঙ্গিমা ”
মিথ্যা কথা বলার সময় ব্যক্তির শরীরি আচরণ বদলে যেতে বাধ্য (যদি না সে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রফেশনাল(!) মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে আরকি) , এরকম কিছু আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আপনি তাঁর মিথ্যা বলার ব্যপারে নিশ্চিত হতে পারেন। একটু খেয়াল করুন-
(i) লোকটি সাধারণ এর তুলনায় অস্বাভাবিক রকম স্থির হয়ে আছে কি?অর্থাৎ হাত-পা/কাঁধের মুভমেন্ট অন্য সময়ের তুলনায় সীমিত হয়ে গেছে কি না
(ii) তাঁর কথার সাথে শরীরি ভাষার(Body language) কোনো অসামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন?
(iii) কথা বলার সময় তাঁর হাত বার বার নাকের কাছে চলে যাচ্ছে কি?
(iv) হাত কি অস্বাভাবিকভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখছে?
(v) কথা বলার সময় একটু কি বেশি পরিমানেই হাতের তালু প্রদর্শন করছে?
(vi) মিথ্যা বলার সময় সহজাত কারণেই যে কোনো ব্যক্তির মধ্যে সামান্য হলেও অপরাধবোধের সঞ্চার হয়ে থাকে, অন্যদের সামনে নিজেকে ছোটো/হীন বলে মনে হয়, এ কারণে মিথ্যা বলার সময় অধিকাংশ লোক নিজের শরীরকে গুটিয়ে আনে,অনেকে পকেটে হাত ঢুকিয়ে রাখে। আপনার সাথে যে ব্যক্তি কথা বলছে,তার আচরণেও কি এমন কিছু খুঁজে পান?দেখুন তো ভাল করে।
উপরের ৬ টি কেসের যে কোনো এক বা একাধিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রায় ৮৫-৯০% মানুষের ক্ষেত্রেই মিথ্যা কথা বলার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
“চোখ যে মনের কথা বলে “
হ্যা,কথা বলার সময় বক্তার চোখের অভিব্যক্তি তাঁর ভেতরের অনেক কিছুকেই প্রকাশ করে,আর যদি আপনি সেটা বুঝে নিতে পারেন কোনো ভাবে, তাহলে লোকটি কোনো কিছু বানিয়ে বলছে কি না তা সহজেই ধরতে পারবেন। একটু লক্ষ্য করুন তো-
(i) কথা বলার সময় লোকটির চোখের মনি অক্ষিকোটরের একেবারে বামে অবস্থান করছে কি না?
(ii) এছাড়া তাঁর চোখের পলক ফেলবার হার বৃদ্ধি পেয়েছে কি না এটাও খেয়াল করুন।
(iii) আবার, সে কথোপকথনের ৭০% বা তার বেশি সময় আপনার সাথে Eye contact (চোখে চোখ রাখা) বজায় রাখছে কি-না সেটাও নজরদারিতে রাখুন।
উপরে তিনটির ভেতর এক বা একাধিক কেস লক্ষ্য করলে আপনি প্রায় নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন লোকটি বানিয়ে কথা বলছে অথবা যা বলছে তাঁর মধ্যে মিথ্যার উপস্থিতি রয়েছে।
“মুখের অভিব্যক্তি ও কন্ঠস্বরে পরিবর্তন “
একজন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলার সময় তাঁর অজান্তেই চেহারায় এবং কন্ঠস্বরে এর কিছু না কিছু প্রভাব পড়েই যায়,যেগুলো যথযথভাবে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমেও আমরা চাইলে তাঁর বলা মিথ্যা কথাগুলোকে সনাক্ত করতে পারি, একটু খেয়াল করে দেখুন তো -
(i) ব্যক্তিটি অপ্রাঙ্গিক হাসি বা কথার প্রেক্ষাপটের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আবেগের প্রকাশ ঘটাচ্ছে কি?
(ii) হঠাত করেই স্বাভাবিকের তুলনায় কথার গতি বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিয়েছে কি না? এছাড়া কন্ঠস্বরের শব্দোচ্চতাও অকস্মাৎ বৃদ্ধি বা হ্রাস পেয়েছে কি না খেয়াল করে দেখুন।
(iii) অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলার সময় তাদের বাক্যগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কিছুটা জটিল হয়ে যায়,অনেকে বলার সময় মাথার ভেতরে কথা সাজাতে গিয়ে হাস্যকর কিছু ভুল করে বসেন, খেয়াল করে দেখুন তো এই ব্যক্তিটিও এরকম কিছু করছেন কি না।
(iv) কপালে ঘাম জমতে শুরু করা, একটু পর পর ঠোট কামড়ানো,ঘন ঘন গলা খাকাড়ি দেওয়া- আঁচ করতে পারছেন তো ব্যাপার স্যাপার?
আচ্ছা একটা ব্যাপার, আমি উপরের আলোচনায় কয়েকবার ই “অস্বাভাবিক” আচরণের কথাটি উল্লেখ করেছি।এখন কথা হচ্ছে,একজন স্বল্প পরিচিত/অপরিচিত মানুষের ক্ষেত্রে আপনি কীভাবে বুঝবেন যে তাঁর এই আচরণটি অস্বাভাবিক ? এটা তখন ই বোঝা যাবে , যখন আপনি জানবেন যে তাঁর স্বাভাবিক আচরণ টা কেমন অর্থাৎ সত্য বলার সময় সে কেমন আচরণ করে। সুতরাং, আপনার প্রথমেই উচিত হবে তাকে খুবই সাধারণ মানের কয়েকটি নিরপেক্ষ প্রশ্ন করা, যেমন “আজকের আবহাওয়া টা কেমন?” অথবা “গতকালকের ক্রিকেট ম্যাচটা তাঁর কাছে কেমন লেগেছে?” ,এরপর পর্যবেক্ষণ করুন- সত্য বলার সময় তাঁর শারীরিক ভঙ্গিমা এবং চোখের মুভমেন্ট কেমন হয়।মোটামুটি যথেষ্ট পরিমান প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করুন যে, আপনি তাঁর স্বাভাবিক আচরণের একটি প্যাটার্ন ধরতে পেরেছেন। এর ফলে, পরবর্তিতে যখন গুরুত্বপূর্ণ কথায় প্রবেশ করবেন, তখন তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ গুলি সহজেই আপনার নজরে পড়ে যাবে।
আজ এ পর্যন্তই ,একটা বলে শেষ করি , আমরা সবাই যদি সত্য কথা বলার চর্চা করি, তাহলে পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস আপনা আপনিই বাড়বে, তখন আর এত টেকনিক খরচ করে মিথ্যাবাদী চেনার খুব একটা প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না।
ভাল থাকবেন সবাই।
written by: রাফি উর রশিদ
(Collected from "রহস্যময় বিজ্ঞান জগত")
Post a Comment